ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের যৌথ হামলা বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সম্পূর্ণ অন্যায় অবৈধ ভাবে একটি স্বাধীন সার্বভোম রাষ্ট্রের উপর সামরিক আগ্রাসন চালানো ইচ্ছামত অন্য দেশের রাষ্ট্রপতি কে তুলে আনা ক্ষমতাচ্যূত করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠীর নিত্য নৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প কেমনে রাখতে হবে ভিনুজুয়েলার প্রেসিডেন্ট কে তুলে আনা আর ইরানে হামলা চালানো, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা কে হত্যা করা এক কথা নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বিশে^ও বড় সন্ত্রাসী পরাশক্তি। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবেনা, যে দেশে কোনো না কোনো ভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপ ঘটেনি। ইস্যু-ননইস্যু কোনোটাই তাদের জন্য ফ্যাক্টও নয়, তারা নন ইস্যুকেও মিডিয়া তে প্রচারণার ঝড় তুলে ইস্যু তৈরি করতে সিদ্ধ হস্ত।
বাংলাদেশ ও নিরাপদ নয়। এদেশের রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিভেদের চোরা গলা গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্য প্রবেশ করে বঙ্গপোসাগরে সামরিক ঘাটি স্থাপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। দ্রুতই বিশ্ববাসী হয়তো দেখতে পাবে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ মানবিক করিডোরের নামে বাংলাদেশের জলসীমানায় সামরিক ঘাটি স্থাপন করছে।
মার্কিন সামাজ্রবাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনে বিশ্বমানবতা নিষ্পেষিত হচ্ছে। গোটা পৃথিবীর মানবতা আজ সামাজ্রবাদের বুলেটের নিচে পদদলিত হচ্ছে। এ আগ্রাসন থেকে নিরপরাধ সাধারণ মানুষ, শিশু ও নারী, স্কুল, হাসতাপাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন কিছুই রক্ষা পাচ্ছেনা। সামাজ্রবাদের মানবতার কথা বলেÑশান্তির কথা বলে। মানবতা লঙ্ঘন হচ্ছেÑএ অজুহাতে তারা পৃথিবীর অনেক দেশকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধের আওতায় এনেছে। পৃথিবীর বহু দেশে সামরিক আগ্রাসন পর্যন্ত চালিয়েছে। কিন্তু তারাই যে মানবতা লঙ্ঘনে পৃথিবীতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সে বিষয়ে তাদের কোনোহুঁশ নেই। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ একটি দেশের নীরিহ নাগরিকদের হত্যা করে। বিশেষত শিশুরাই হয় এর প্রধান শিকার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ১৯৯৫ সালে বলেছে, ইরাকের বিরুদ্ধে পশ্চিমা শক্তির অবরোধের ফলে পাঁচ লক্ষ সাতষট্টি হাজার পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু মারা গেছে। অথচ সেদিকে তাদের খেয়াল নেই। তাদের খেয়াল হচ্ছে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে অস্ত্র বাণিজ্য করা, তেল-গ্যাস সম্পদ কুক্ষিগত করা, পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করা। মার্কিন সামাজ্রবাদ ও তার দোসররা তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে মুসলমানদের উপর একচেটিয়া ভাবে সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের অপবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে অথচ পুরো পৃথিবীতে মুসলমানরাই সন্ত্রাসের বলির পাঠা হচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশে^র মোট সন্ত্রাসী ঘটনার ৫ শতাংশের জন্য ও মুসলমানরা দায়ী নয়। ইউরোপে ৯৯.৬ শতাংশ সন্ত্রাসী হামলাই হয়ে থাকে অমুসলিমদের মাধ্যমে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রায় শেষ প্রান্তে জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলে মার্কিন সামাজ্রবাদ নৃশংস হত্যাকা-ের রেকর্ড স্থাপন করে। আর তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেশে দেশে একের পর এক বোমা ও বুলেট চালিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছে। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক ও ইরান সহ বিশে^ও অনেক দেশেই মার্কিন সামাজ্রবাদ ও তার দোসররামানব রক্তের হোলি খেলে চলেছে।
মার্কিন সামাজ্রবাদ বিশ্বব্যাপী ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত একের পর এক সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের সামরিক আগ্রাসনের তথ্যচিত্র:
চীনে ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত
কোরিয়ায় ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত
ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৫৮ সাল
কিউবায় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত
গুয়েতেমালায় ১৯৪৫ সালে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত
ভিয়েতনামে ১৯৬১ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত
কঙ্গোয় ১৯৬৪ সালে
লাওসে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত
পেরুতে ১৯৬৫ সালে
কম্বোডিয়ায় ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত
নিকারাগুয়ায় ১৯৮০ সালে
সুদানে ১৯৮৬ সালে
লিবিয়ায় ১৯৮৬ সালে
পানামায় ১৯৮৯ সালে
বসনিয়াহার্জেগোভিনায় ১৯৯৫ সালে
যুগোস্লাভিয়ায় ১৯৯৯ সালে
আফগানিস্তানে ২০০১ থেকে
ইরাকে ১৯৯১ সাল থেকে
ইরান ২০২৬ মার্চ থেকে
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ পুঁজির অন্তর্গত প্রবণতা গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ৬০ দশকে ভিয়েতনামে মার্কিনী গণহত্যা, বর্বরতা ও ধ্বংসযজ্ঞ এমন মাত্রায় গিয়েছিল যে, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল হয়েছিল। ব্রিটিশ প-িত, দার্শনিক, গণিতবিদ বার্টান্ডরাসেল ছিলেন সেই ট্রাইব্যুনালের প্রধান। তিনি উদার গণতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধ তাকে এই শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, সারা পৃথিবীতে মানুষের যদি একটা মাত্র লড়াই করতে হয় তাহলে সেই লড়াই টা করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। মার্কিন সামাজ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই না কওে গণতন্ত্র, শান্তিবা স্বাধীনতা কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবেনা। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখিয়ে ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকী ভাবে ক্রমান্বয়ে যুদ্ধের সাথে অবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মানে ই যুদ্ধ, যুদ্ধ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কোনো অস্তিত্ব নেই। যেমনÑপেট্রোল পাম্প, রেস্টুরেন্ট, কারখানা, গাড়ি কারখানা, সবকিছু এমনকি তার বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় সব প্রতিষ্ঠানই কোনোনা কোনো ভাবে যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত। সেটাকে আমরা বলছি বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে দেখা যাবে যে ডিফেন্সের সাথে সম্পর্কিত কিংবা ডিফেন্সের সাথে সম্পর্কিত যে ডিপ্লোম্যাসি, ডিফেন্স সম্পর্কিত নানা রকম শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সেগুলোও আছে। সায়েন্স প্রতিষ্ঠান, সায়েন্স রিসার্চে দেখা যাবে যুদ্ধাস্ত্র গবেষণা হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পের বড় ক্রেতা হচ্ছে যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান বা কারখানা। পানি সাপ্লাই করছে যে তার বড় জোগান যাচ্ছে যুদ্ধ ক্ষেত্রে। কাপড় তৈরি হচ্ছে, তার বড় অংশের ক্রেতা পেন্টাগন, ক্যান্টনমেন্ট। এমআইটি, হার্ভার্ডেও মতো বিশ্ববিদ্যালয় গুলো খুবই ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত, কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বরাদ্দ আসে পেন্টাগন থেকে, কোনো না কোনো ভাবে যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত গবেষণা করার জন্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হচ্ছে সমরাস্ত্র নির্ভর অর্থনীতি। অনেকের মতে সামাজ্রবাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের লোভে যুদ্ধ করছে। কথাটি সত্য। তবে সর্বাংশে সত্য নয়। শুধু তেলের জন্য নয়Ñআমাদের মনে রাখতে হবে যুদ্ধ ব্যতীত সামাজ্রবাদ বিশ্ব ব্যবস্থা তথাবিশ^ পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে কলামিস্ট ও লেখক ফরহাদ মজহার তাঁর সামাজ্রবাদ প্রবন্ধে উল্লেখ করেনÑ‘তেলের জন্য যুদ্ধ কথাটা দিয়ে সামাজ্রবাদকে আমরা বুঝব না। মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের পুঁজিতান্ত্রিক চরিত্রের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্কটা কে বরং আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে।
যুদ্ধাস্ত্র বা মারণাস্ত্র পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার এমন এক পণ্য যা তেল, সাবান বা টুথপেস্ট নয়। যদি এসব পণ্যেও বিক্রি নিশ্চিত করতে হয় এবং মুনাফা কামাতে হয় তাহলে কোথাও না কোথাও যুদ্ধ লাগাতেই হবে। অস্ত্রের উৎপাদন ও বাজার থাকা মানেই যুদ্ধ ও সহিংসতা বিশ^ ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। নইলে মারণাস্ত্র বিক্রি হবেনা। এর কোনো অন্যথা নেই। তবু প্রশ্ন জাগতে পারে অস্ত্র উৎপাদক দেশগুলো অন্য দেশে তাদের অস্ত্র বিক্রি কওে নিজের দেশের বাইরে ভিন্ন ভূখ-ে যুদ্ধ লাগিয়ে রাখতে পারে। আসলে তারা এটাই করে। তবে সাধারণত দেখা যায় সরাসরি তারা যখন নিজেরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সেটা তাদের অর্থনৈতিক সংকট মোচনের জন্য, যুদ্ধ ছাড়া নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখার আর কোনো সম্ভাব্য পথ খোলানা থাকার কারণে যুদ্ধে তাদের জড়িয়ে পড়তেই হয়।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করলো। ইরাক আক্রমণকরার সাথে সাথে অনেক গুলো প্রতিষ্ঠান চাঙ্গা হয়ে উঠলো। যুদ্ধের আগে যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ বিমান প্রস্তুতকারক সব প্রতিষ্ঠান কিংবা নানামুখী নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গুলোর মুনাফার হার কমে যাচ্ছিল। ইরাক আক্রমণে তাদের মুনাফার হার দ্রুত বেড়ে গেল। মার্কিন তেল কোম্পানি যারা নানা বিধ সংকটের মধ্যে ছিল, ইরাক আক্রমণের সাথে সাথে তাদের শেয়ারের দাম বেড়ে গেল। ইরাক ধ্বংসযজ্ঞ যত চলল ততো নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গুলোর রমরমা ব্যবসা তৈরি হতে থাকলো। নাই মি ক্লেইন নামে একজন কানাডীয় লেখক গবেষক সম্প্রতি মার্কিন নীতি সম্পর্কে বলেছেন, এটা হলো, প্রথমে ধ্বংস কর, ধ্বংস না করলে আমরা কন্সট্রাকশন বা নির্মাণ করবো কীভাবে ?
বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কন্সট্রাকশন ও কনসালট্যান্সি চুক্তি বিভিন্ন কোম্পানির হাতে এসেছে। বুশ প্রশাসনের ডিকচেনি, রামস ফেল্ড এরা সবাই এরকম বিভিন্ন সুবিধাভোগী কোম্পানির সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং একটা যুদ্ধ মানেই হচ্ছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো ভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠা। এর সাথে সাম্প্রদায়িক, বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী, দৃষ্টিভঙ্গী, মতাদর্শ ও রাজনীতি তোআছেই। (তথ্যসূত্র : পুঁজির অন্তর্গত প্রবণতাÑআনু মুহাম্মদ)
লেখক, গবেষক, কলামিষ্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমী